বাংলার মানুষের বুকের বাঁ দিকটাই ক্রিকেটকে অনেকটা জায়গা অধিকার করে নিতে যে মানুষটার ভূমিকা সবথেকে বেশি তিনি হলেন সৌরভ গাঙ্গুলি। বাংলা থেকে শুরু করে আপামোর ভারতবাসীর কাছে তিনি হলেন স্নেহের “দাদা”।
অনেকে তাঁকে ভালোবেসে মহারাজা ও বলেন, কারন তাঁর ছোট বেলার ডাকনাম ছিল মহারাজ। তিনি বিসিসিআইয়ের ৩৯তম সভাপতি, ধারাভাষ্যকার এবং জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক। তাঁর ক্যারিয়ারে, তিনি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ব্যাটসম্যান এবং ভারতীয় জাতীয় ক্রিকেট দলের অন্যতম সফল অধিনায়ক।
বুক চিতিয়ে লড়াই করে বারবার রঙ্গমঞ্চে ফিরে আসার এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। তিনিই প্রথম ভারতীয় ক্রিকেটার যিনি বিদেশীর চোখে চোখ রেখে কথা বলেছেন। বিদেশী অধিনায়ককে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন টস করানোর জন্য। অহংকার আর রাজকীয় মহিমায় শাসন করেছেন ক্রিকেট বিশ্বকে। চলুন আজ এই মহান ব্যাক্তিত্ত, ক্রিকেট প্রেমীদের দাদা সৌরভ গাঙ্গুলিকে নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।
আরো পড়ুন : সাই সুদর্শন জীবনী
সৌরভ গাঙ্গুলি জীবনী (Sourav Gangul Biography in Bengali)
সৌরভ গাঙ্গুলির জন্ম, পরিবার এবং শিক্ষা
সৌরভ গাঙ্গুলি ১৯৭২ সালের ৮ জুলাই কলকাতায় এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম চণ্ডীদাস গঙ্গোপাধ্যায় ও মাতার নাম নিরুপা গঙ্গোপাধ্যায়। সৌরভ মূলত তার দাদা স্নেহাশিসের সাহায্যে ক্রিকেট জীবনের সূচনা করেন।
তাঁর বাবা ছিলেন শহরের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে একজন এবং তিনি একটি সমৃদ্ধ ছাপাখানার ব্যবসা পরিচালনা করতেন। দীর্ঘ অসুস্থতার পর, ২০১৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ৭৩ বছর বয়সে তাঁর বাবা মারা যান।
যেহেতু কলকাতার মানুষের প্রিয় খেলা ছিল ফুটবল তাই সৌরভ গাঙ্গুলি প্রথমে ফুটবল খেলতেন, কিন্তু পরে ক্রিকেটের প্রতি তিনি আকৃষ্ট হন। তবে, তাঁর মা তাকে কোনও খেলাধুলাকে ক্যারিয়ার হিসেবে গ্রহণ করার ব্যাপারে খুব একটা সমর্থন করেননি। তাঁর দাদা স্নেহাশিস গাঙ্গুলি সেই সময় বাংলা ক্রিকেট দলের হয়ে খেলতেন তাই তিনি ভাই সৌরভ কে সব সময় সমর্থন করেন।
সৌরভ গাঙ্গুলি কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজিয়েট স্কুলে পড়াশোনা করেন। এরপর তিনি কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে বাণিজ্যে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি তার দাদার কাছে ক্রিকেট শিখেছিলেন এবং ডানহাতি হওয়া সত্ত্বেও, তিনি বামহাতে ব্যাটিং শিখেছিলেন যাতে তিনি তাঁর দাদার খেলার সরঞ্জাম ব্যবহার করতে পারেন।
তিনি ওড়িশা অনূর্ধ্ব-১৫ এর ম্যাচে একটি সেঞ্চুরি করেছিলেন এবং সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলের ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হয়েছিলেন। ১৯৮৯ সালে, সৌরভ গাঙ্গুলিকে বাংলা দলে খেলার জন্য নির্বাচিত করা হয়। কাকতালীয়ভাবে, সেই বছরই তার ভাই দল থেকে বাদ পড়েন। ১৯৯০-৯১ মৌসুমে রঞ্জি ট্রফিতে দুর্দান্ত পারফর্ম করার পর, বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যান আলোচনায় আসেন।
আরো পড়ুন : মহেন্দ্র সিং ধোনি জীবনী
সৌরভ গাঙ্গুলির বয়স
সৌরভ গাঙ্গুলির জন্ম ৮ জুলাই, ১৯৭২ সালে কলকাতার বেহালায়। আজ, ৮ জুন, ২০২৫ তারিখে, তাঁর বয়স ৫২ বছর, আগামী জুলাই মাসে তাঁর ৫৩ তম জন্মদিন।
সৌরভ গাঙ্গুলির আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক
১৯৯২ সালে, তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক করেন। কিন্তু এই ম্যাচটি তাঁর জন্য ভালো সুভারম্ভ ছিল না, কারণ তিনি ব্রিসবেনের গাব্বায় অনুষ্ঠিত একটি ওয়ানডেতে ৬ নম্বরে ব্যাট করতে নেমে মাত্র ৩ রান করতে পেরেছিলেন। এরপর তাঁর আচরণ কে ও “অহংকারী” বলে মনে করা হয়েছিল এবং খেলার প্রতি তার মনোভাবকে প্রকাশ্যে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছিল, আরও কিছু অভ্যন্তরীণ ঘটনা পরস্থিতি কে তাঁর বিপক্ষে নিয়ে গিয়েছিল, এবং শেষ পর্যন্ত তাকে তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।
এরপর তিনি ঘরোয়া ক্রিকেটে ফিরে যান এবং কঠোর পরিশ্রম করেন। ৯৩, ৯৪ এবং ৯৫ ধারাবাহিক রঞ্জি মৌসুমে তিনি একজন অসাধারণ রান সংগ্রাহক ছিলেন। ১৯৯৫-৯৬ সালে দলীপ ট্রফিতে তিনি ১৭১ রান করেন এবং ভারতীয় জাতীয় দলে পুনরায় ডাক পান। ১৯৯৬ সালে ইংল্যান্ড সফরে তিনি জাতীয় দলের হয়ে খেলেছিলেন।
এরপর, সৌরভ গাঙ্গুলি তাঁর টেস্ট অভিষেকের সুযোগ পান। প্রথমবারের মতো, লন্ডনের লর্ডসে অনুষ্ঠিত সফরের দ্বিতীয় টেস্টে তিনি জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করেন। এই একই ম্যাচে রাহুল দ্রাবিড়ও তার টেস্ট অভিষেক করেন। সৌরভ গাঙ্গুলি ১৩১ এবং রাহুল দ্রাবিড় ৯৫ রান করেন। ট্রেন্ট ব্রিজে পরবর্তী টেস্টে, সৌরভ গাঙ্গুলি ১৩৬ রান করেন এবং লরেন্স রো এবং অ্যালভিন কালিচরণের পরে ইতিহাসের তৃতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে সেঞ্চুরি করেন। তাঁর অসাধারণ সময় বোধের জন্য তাঁকে “god of the Off side” বলা হত।
তিনি শচীন টেন্ডুলকারের সাথে ২৫৫ রানের জুটিও ভাগ করে নেন, যা সেই সময়ে ভারতের বাইরে যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে ভারতের সর্বোচ্চ জুটি হয়ে ওঠে। টেস্টটি ড্রতে শেষ হয়, ইংল্যান্ড ১-০ ব্যবধানে সিরিজ জয় করে, সৌরভ গাঙ্গুলি দ্বিতীয় ইনিংসে ৪৮ রান করেন।
আরো পড়ুন : বৃষ্টি না হলে এই ইংল্যান্ড বনাম ভারত সিরিজ আমরা জিতেই ফিরতে পারতাম
সৌরভ গাঙ্গুলির অধিনায়কত্বের যুগ
২০০০ সালে দলের কিছু খেলোয়াড়ের ম্যাচ ফিক্সিং কেলেঙ্কারির পর সৌরভ গাঙ্গুলিকে ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হিসেবে মনোনীত করা হয়। টেন্ডুলকার তাঁর স্বাস্থ্যের জন্য পদ থেকে পদত্যাগ করার কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এবং সেই সময় সৌরভ গাঙ্গুলি সহ-অধিনায়ক ছিলেন।
অধিনায়ক হিসেবে তার শুরুটা ভালো ছিল এবং পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ভারতকে সিরিজ জয়ের দিকে নিয়ে যায়। ২০০০ সালের আইসিসি নকআউট ট্রফির ফাইনালে ভারতীয় দলকে নেতৃত্ব দেন তিনি এবং নিউজিল্যান্ডকে পরাজিত করেন।
এরপর আসে ২০০১ সালের টেস্ট সিরিজ যা সৌরভ গাঙ্গুলির পাশাপাশি ভারতীয় ক্রিকেটের জন্যও ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারন সেই সময়ে অস্ট্রেলিয়া চ্যাম্পিয়ন ছিল এবং তাদের পরাজিত করা যেকোনো দলের জন্য একটি দূরবর্তী স্বপ্নের মতো ছিল। ২০০১ সালে সৌরভ গাঙ্গুলির অধিনায়কত্বে ভারত অস্ট্রেলিয়ার টানা ১৬টি টেস্ট ম্যাচ জয়ের ধারা ভেঙে দেয়।
ন্যাটওয়েস্ট সিরিজের সময়, সৌরভ গাঙ্গুলির ক্যারিয়ারের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা যেখানে লর্ডসে ভারত ইংল্যান্ডকে একদিনের আন্তর্জাতিকে হারিয়েছিল এবং লর্ডসের বারান্দা থেকে তিনি তার টি-শার্টটি উড়িয়ে ছিলেন। মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফ তার টি-শার্টটি উড়িয়ে ছিলেন আর তারই প্রতিক্রিয়া স্বারুপ সৌরভ গাঙ্গুলি লর্ডসের বারান্দায় নিজের টি-শার্ট উড়িয়ে ছিলেন। এই ঘটনা তাঁর আত্মসম্মান বোধ এবং লড়াকু মনভাবের পরিচয় দেয়।
১৯৮৩ সালের পর প্রথমবারের মতো ২০০৩ সালে ভারত বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌছেছিল কিন্তু অস্ট্রেলিয়ানদের কাছে হেরে যায়। ব্যক্তিগতভাবে, সৌরভ গাঙ্গুলির একটি সফল টুর্নামেন্ট ছিল, তিনি ৫৮.১২ গড়ে ৪৬৫ রান করেছিলেন, যার মধ্যে তিনটি সেঞ্চুরি ছিল।
২০০৪ সাল নাগাদ অধিনায়ক হিসেবে তিনি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছিলেন এবং মিডিয়ার একাংশ তাকে ভারতের সবচেয়ে সফল অধিনায়ক হিসেবে বিবেচনা করেছিল। তার অধিনায়কত্বের সময়, বিশেষ করে বিশ্বকাপ, ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়া সফর এবং ২০০৪ সালে পাকিস্তান সিরিজের পরে তার ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের অবনতি ঘটে। ১৯৬৯ সালের পর প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়া ভারতে টেস্ট সিরিজ জিতেছে।
আরো পড়ুন : সরফরাজ খানের কঠোর পরিশ্রম বিফলে গেলো! কেনো নেই তার নাম ভারতীয় টেস্ট স্কোয়াডে?
অধিনায়ক পদ থেকে অপসারন
২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে, প্রাক্তন অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার গ্রেগ চ্যাপেল ভারতের প্রধান কোচ হন। সৌরভ গাঙ্গুলির সাথে গ্রেগ চ্যাপেলের কিছু মতবিরোধ ঘটে। সেই সময় গ্রেগ চ্যাপেল ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডকে ইমেল করেছিলেন যে গাঙ্গুলি “শারীরিক ও মানসিকভাবে” ভারতকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য অযোগ্য। এই সব ঘটনার সঙ্গে ২০০৪ সালে তাঁর উদাসীন মনভাব এবং ২০০৫ সালে খারাপ পারফরমান্সের কারণে, ২০০৫ সালের অক্টোবরে সৌরভ গাঙ্গুলিকে দল থেকে বাদ দেওয়া হয়। অধিনায়কত্ব তার প্রাক্তন সহ-অধিনায়ক রাহুল দ্রাবিড়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
সৌরভ গাঙ্গুলির প্রত্যাবর্তন
২০০৫ সালের পর আবার সৌরভ গাঙ্গুলির জীবনে শুরু হয় নিজেকে প্রমাণ করার লড়াই। দশ মাস পর ভারতের দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের সময়, তাঁর মিডল অর্ডারের বদলি হিসেবে সুরেশ রায়না এবং মোহাম্মদ কাইফ খারাপ ফর্মে থাকার পর সৌরভ গাঙ্গুলিকে দলে ডাকা হয়।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে প্রথম টেস্টে তিনি ৫১ রান করেন এবং, ভারত ম্যাচটি জিতেছিল। এরপর তাঁকে ওয়ানডে দলেও ডাকা হয় এবং কিছু চিত্তাকর্ষক পারফর্মেন্স তাকে ২০০৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে জায়গা করে দেয়। আবার তিনি বিভিন্ন ফর্ম্যাটে ভালো পারফর্ম করতে শুরু করেন এবং ২০০৭ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রথম টেস্ট-এ ডাবল সেঞ্চুরি করেন। আর এই সময়েই তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানানোর সিদ্ধান্ত নেন। ২০০৮ সালে ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে একটি টেস্ট সিরিজে ৪ টেস্টে ৫৪ গড়ে ৩২৪ রান করার পর তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেন।
সৌরভ গাঙ্গুলির আইপিএল এবং অবসর
২০০৮ সালে, তিনি ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের উদ্বোধনী সংস্করণের অন্যতম আইকন খেলোয়াড় ছিলেন। তিনি বলিউড তারকা শাহরুখ খানের মালিকানাধীন ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্সের অধিনায়ক ছিলেন। এর পর তিনি পুনে ওয়ারিওরস এর হয়ে ২০১১ ও ২০১২ সালে আই পি এল ম্যাচ খেলেছিলেন। তিনি ২০১২ সালের ১৯সে মে কলকাতার বিরুদ্ধে শেষ ম্যাচ খেলে ক্রিকেট জীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
সৌরভ গাঙ্গুলির অবসর পরবর্তী জীবনঃ
২০০৭ সালে তিনি শুধু মাত্র ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়েছিলেন, জীবন থেকে নন। অবসর পরবর্তী জীবনে নানান কাজের সাথে যুক্ত হয়ে তিনি নিজের জীবন খাতায় জুড়ে দিয়েছেন আরও অনেক নতুন পাতা। টেলিভিশন চ্যানেল জি বাংলায় দাদাগিরি আনলিমিটেড শিরোনামের রিয়েলিটি কুইজ শোয়ের উপস্থাপক হিসেবে তিনি দীর্ঘ কাল নিযুক্ত ছিলেন। এই অনুষ্ঠান টি পশ্চিমবঙ্গ বাসীর কাছে বিশেষ জনপ্রিয় ছিল। তাঁকে সিএবির ক্রিকেট উন্নয়ন কমিটির চেয়ারম্যানও নিযুক্ত করা হয়েছিল। ২০১৯ সালে, সৌরভ গাঙ্গুলি ভারতীয় ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের সভাপতি নির্বাচিত হন।
সৌরভ গাঙ্গুলির রেকর্ডস
ব্যাটিং রেকর্ড
- ১৯৯৯ বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ১৮৩ রান করেছিলেন – বিশ্বকাপের ইতিহাসে কোনও ভারতীয়ের সর্বোচ্চ।
- ১৯৯৯ বিশ্বকাপে রাহুল দ্রাবিড়ের সাথে ৩১৮ রানের জুটি – এখনও বিশ্বকাপে ভারতের সর্বোচ্চ।
- ২০০৭ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে দ্বিশতরান (২৩৯) করেছিলেন – টেস্টে কোনও ভারতীয় বামহাতি ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ।
- আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ৩টি সেঞ্চুরি করেছিলেন – যেকোনো খেলোয়াড়ের সর্বোচ্চ।
- ১৯৯৬ সালে লর্ডসে অভিষেকে টেস্টে সেঞ্চুরি করেছিলেন।
- প্রথম দুটি টেস্ট ম্যাচে সেঞ্চুরি করা মাত্র কয়েকজনের মধ্যে একজন।
অধিনায়কত্বের রেকর্ড
- পাকিস্তানে টেস্ট সিরিজ জয়ী প্রথম ভারতীয় অধিনায়ক (২০০৪)।
- বিদেশে ভারতকে ১১টি টেস্ট জয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন – সেই সময়ে কোনও ভারতীয় অধিনায়কের সর্বোচ্চ।
- তার অধিনায়কত্বে, ভারত ২০০৩ বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছেছিল।
- অলরাউন্ড এবং ওয়ানডে অর্জন
- ১১,০০০-এরও বেশি ওয়ানডে রান করেছেন (১১,৩৬৩) – বিশ্বের নবম সর্বোচ্চ।
- ১০০+ ওয়ানডে উইকেট নিয়েছেন – একজন শীর্ষ-অর্ডার ব্যাটসম্যানের জন্য এটি একটি বিরল কৃতিত্ব।
- মাত্র পাঁচজন ক্রিকেটারের মধ্যে একজন যিনি ওয়ানডেতে ১০,০০০+ রান, ১০০ উইকেট এবং ১০০টি ক্যাচ নিয়েছেন।
- ১৯৯৭ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে সাহারা কাপে টানা ৪টি ম্যান অফ দ্য ম্যাচ পুরস্কার জিতেছেন।
- ১৯৯৯ সালে ১,৭৬৭ ওয়ানডে রান করেছেন – এক ক্যালেন্ডার বছরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
- ২০০০ সালে ৭টি ওয়ানডে সেঞ্চুরি করেছেন – এক বছরে যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
- তার ক্যারিয়ারে ওয়ানডেতে দ্রুততম ৬,০০০-৯,০০০ রান করা খেলোয়াড়দের মধ্যে একজন।
সৌরভ গাঙ্গুলির -এর মোট সেঞ্চুরি
সৌরভ গাঙ্গুলি তার ক্রিকেট ক্যারিয়ারে মোট ৩৮টি আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরি করেছেন:
টেস্ট সেঞ্চুরি: ১৬
ওয়ানডে সেঞ্চুরি: ২২
সৌরভ গাঙ্গুলির প্রাপ্ত পুরষ্কার
১. পদ্মশ্রী (২০০৪) – ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরষ্কার, যা ভারতীয় ক্রিকেটে অসামান্য অবদানের জন্য দেওয়া হয়।
২. বঙ্গ বিভূষণ পুরষ্কার (২০১৩) – পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরষ্কার, যা রাজ্য সরকার কর্তৃক ক্রীড়াক্ষেত্রে তার শ্রেষ্ঠত্বের জন্য প্রদান করা হয়।
৩. অর্জুন পুরষ্কার (১৯৯৭) – ক্রিকেটে তার কৃতিত্বের জন্য ভারত সরকার কর্তৃক প্রদত্ত মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় ক্রীড়া পুরষ্কার।
৪. সিইএটি ক্রিকেটার অফ দ্য ইয়ার (২০০০) – সেই বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার অসাধারণ পারফরম্যান্সের জন্য।
৫. উইজডেন ক্রিকেটার অফ দ্য ইয়ার (১৯৯৯) – শ্রেষ্ঠত্বের জন্য উইজডেন অ্যালমান্যাক কর্তৃক সম্মানিত পাঁচ ক্রিকেটারের একজন।
৬. ভারতের অন্যতম সফল অধিনায়ক হিসেবে স্বীকৃত, যিনি ২০০৩ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে ভারতকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং বিদেশে বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক জয়ও জিতেছিলেন।
৭. বিসিসিআইয়ের সভাপতি নিযুক্ত (২০১৯-২০২২), খেলার বাইরেও তার অবদানের প্রমাণ।
সৌরভ গাঙ্গুলিকে নিয়ে বিতর্ক
১। দেশীয় ক্রিকেটে তার সময়কালে তাকে প্রায়শই অহংকারী বলে সমালোচিত হতে হয়েছিল এবং যাকে তাঁর ভক্তরা “রাজকীয় আচরণ” হিসেবে চিহ্নিত করে।
২। ২০০১ সালে ভারত-অস্ট্রেলিয়া সিরিজে, তিনি প্রায় প্রতিটি খেলায় টসের জন্য দেরিতে রিপোর্ট করেছিলেন। এর জন্য তাঁর সময় বোধ নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছিল।
৩। একবার আম্পায়ারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মতবিরোধ দেখানোর জন্য সৌরভ গাঙ্গুলিকে তিনটি ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
৪। ২০০৫ সালে ভারতীয় ক্রিকেট দলের তৎকালীন কোচ গ্রেগ চ্যাপেলের সাথে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং পরবর্তীতে তাকে অধিনায়ক পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়।
সৌরভ গাঙ্গুলির বাক্তিগত জীবন
১৯৯৭ সালে সৌরভ গাঙ্গুলি একজন প্রশিক্ষিত ওড়িশি নৃত্যশিল্পী ডোনা গাঙ্গুলিকে বিয়ে করেন। প্রথমে তাদের পরিবার তাদের বিবাহের বিরোধিতা করেছিল, তাই তারা পালিয়ে যায় এবং পরবর্তী কালে দুই পরিবার আবার নিজেদের মধ্যে সব ঝামেলা মিটিয়ে নেয়। ২০০১ সালে তাদের এক কন্যা সন্তান হয় যার নাম সানা গাঙ্গুলি।
সৌরভ গাঙ্গুলির আর্থিক প্রতিপত্তি
সৌরভ গাঙ্গুলির আনুমানিক মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ₹৪০০-৫০০ কোটি, যা তিনি তার ক্রিকেট ক্যারিয়ার, বিজ্ঞাপন, টিভি অনুষ্ঠান এবং বিসিসিআইয়ের প্রাক্তন সভাপতি হিসেবে তার ভূমিকার মাধ্যমে অর্জন করেছেন। তিনি মাই১১সার্কেল, সেনকো গোল্ড এবং পুমার মতো বড় ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন দেন এবং বাংলা কুইজ শো দাদাগিরি আনলিমিটেডেরও উপস্থাপক। গাঙ্গুলি কলকাতার বেহালায় একটি বিলাসবহুল পৈতৃক বাড়িতে থাকেন এবং শহর জুড়ে বিনিয়োগের ফ্ল্যাট এবং বাণিজ্যিক স্থান সহ একাধিক সম্পত্তির মালিক।
সৌরভ গাঙ্গুলির ফুটবল টিম
ছোটবেলা থেকে সৌরভ গাঙ্গুলির ফুটবল এর প্রতি একটা আকর্ষণ ছিল। তাই তিনি অবসর পরবর্তী সময়ে কলকাতা ভিত্তিক একটি বিখ্যাত ইন্ডিয়ান সুপার লিগ (আইএসএল) ফুটবল দল “এটিকে মোহনবাগান এফসির” সহ-মালিক হন। দলটি পরে ২০২০ সালে ঐতিহাসিক মোহনবাগান ক্লাবের সাথে একীভূত হয়। তার সহ-মালিকানার অধীনে, দলটি তিনবার আইএসএল শিরোপা জিতেছে। গাঙ্গুলির অংশগ্রহণ ফুটবলের প্রতি তার আবেগ এবং পশ্চিমবঙ্গ এবং সমগ্র ভারতে এই খেলাটির প্রচারের প্রচেষ্টাকে প্রতিফলিত করে।
F.A.Q: Sourav Gangul Biography in Bengali
১। সৌরভ গাঙ্গুলি কে?
সৌরভ গাঙ্গুলির একজন প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার।
২। সৌরভ গাঙ্গুলির জন্ম কবে হয়?
সৌরভ গাঙ্গুলির এর জন্ম হয় ৮ জুলাই ১৯৭৩ সালে।
৩। সৌরভ গাঙ্গুলির স্ত্রীর নাম কী?
সৌরভ গাঙ্গুলির এর স্ত্রীর নাম ডোনা গাঙ্গুলি।
৪। সৌরভ গাঙ্গুলি কী কী পুরস্কার পান?
সৌরভ গাঙ্গুলির প্রাপ্ত পুরস্কার – পদ্মশ্রী, বঙ্গ বিভূষণ পুরষ্কার ও অর্জুন পুরস্কার।
উপসংহার
তিনি হলেন মহারাজ, বাঙালির দাদা, ক্রিকেট জগতে বাংলার ঘরের ছেলে। ১৯৯২ থেকে দেশের হয়ে ক্রিকেট খেলা শুরু, ২০১২ তে শেষ আইপিএল ম্যাচ খেলা, এই দীর্ঘ সময়কালে তাঁর জীবনে ঘটেছে অনেক ঘটনা। অবসরের পরেও তিনি সমান তালে চালিয়ে যাচ্ছেন নিজের জীবন ছন্দ কে। বাঙালির কাছে তিনি অনুপ্রেরনা। তাঁর বিবাহিত জীবনের সুরুর দিকের গল্পটাও সিনেমার গল্পের থেকে কম না। এই সব মিলিয়ে তিনি সৌরভ গাঙ্গুলি।
নমস্কার, প্রিয় পাঠকগণ। আমার নাম শুভম বিশ্বাস। আমি গত ৫-৬ বছর ধরে ব্লগিং করছি। এই ব্লগটা শুরু করেছি বাংলায় ক্রিকেট খবর এবং আইপিএল নিয়ে লেখার জন্য। ক্রিকেট আমার ছোটবেলা থেকেই একটা ভালোলাগার জায়গা তাই সেই ভালো লাগাকে কাজে লাগিয়ে এই নতুন উদ্যোগ।