ক্রিকেটের দুনিয়ায় ভারতবর্ষকে উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসাবে প্রকাশ করতে যে সব বাক্তিরা বিশেষ ভূমিকা পালন করেন তাদের মধ্যে উল্লেখ যোগ্য এবং সর্ব পরিচিত নাম হল শচীন তেন্ডুলকর। ১৩০ কোটির এই ভারতবর্ষে শচীন তেন্ডুলকর এর নাম জানেন না এমন লোক খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তিনি ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বোচ্চমানের ব্যাটসম্যান হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত।
মাত্র ষোলো বছর বয়সে ক্রিকেট দুনিয়ায় পা রাখা তারপর আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের হয়ে বহু ক্রিকেট ম্যাচ খেলা। টেস্ট ক্রিকেট ও একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলায় সর্বোচ্চসংখ্যক শতকের অধিকারী হওয়া সহ নানান রেকর্ড আজ তাঁর ঝুলিতে। অর্জন করেছেন পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ এর মত ভারতের বিভিন্ন ভারতীয় সর্বোচ্চ পুরস্কার।
কিন্তু, শচীন তেন্ডুলকর-এর ক্রিকেট জীবন একদমই সমান ও সোজা ছিল না, তাঁর জীবনে এসেছে অনেক চরাই উতারাই। সব ঝর সামলে আজ তিনি ভারতবর্ষের সবার প্রিয় ক্রিকেটার হওয়ে উঠেছেন। চলুন আজ এই বিশ্ববিখ্যাত ক্রিকেটার শচীন তেন্ডুলকর-এর জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।
শচীন তেন্ডুলকর জীবনী |Sachin Tendulkar Biography in Bengali
জন্ম ও শৈশব
১৯৭৩ সালের ২৪ এপ্রিল মুম্বাইতেএক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হয়েছিল শচীনতেন্ডুলকর (Sachin Tendulkar) এর । শচীন রমেশ তেন্ডুলকর হল তাঁর সম্পূর্ণ নাম। তাঁর পিতার নাম রমেশ তেন্ডুলকর ও মাতার নাম রজনী তেন্ডুলকর। তাঁর পিতা একজন মারাঠি ঔপন্যাসিক ছিলেন এবং তাঁর মাতা বীমা কোম্পানিতে কাজ করতেন।
শচীনের দুই দাদার নাম নিতিন ও অজিত এবং দিদির নাম সবিতা তাঁর বাবা রমেশের প্রথম পক্ষের স্ত্রীর সন্তান ছিলেন। শৈশব কালে শচীন তেন্ডুলকর ও তাঁর পরিবার মুম্বাই এর বান্দ্রা (পূর্ব) অঞ্চলের সাহিত্য সহবাস কো-ওপারেটিভ হাউসিং সোসাইটিতে বসবাস করতেন। ছোটবেলা থেকেই শচীন খুব চঞ্চল ছিলেন। ছোট্ট বন্ধুদের সাথে সারা পাড়ার অলিতে গলিতে শচীন খেলে বেরাতেন। ২ বছর বয়স থেকেই ক্রিকেট খেলার প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে ছোট্ট শচীন-এর।
আরো পড়ুন : বিরাট কোহলি জীবনী
শচীন তেন্ডুলকর-এর বয়স
শচীন তেন্ডুলকর ১৯৭৩ সালে জন্মগ্রহন করনে। বর্তমানে তাঁর বয়স ৫২ বছর।
ক্রিকেট শিক্ষা
শচীন তেন্ডুলকর-এর সর্বপ্রথম ক্রিকেট কোচ ছিলেন রমাকান্ত আচরেকর। শচীন তেন্ডুলকরের দাদা অজিত ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে তাকে দাদরের শিবাজী পার্ক অঞ্চলে বিখ্যাত ক্রিকেট কোচ রমাকান্ত আচরেকরের কাছে নিয়ে যান। কোচের নির্দেশে দাদা আজিত শচীনকে শারদাশ্রম বিদ্যামন্দির উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করে। কারন সেটি ছিল ক্রিকেট খেলার জন্য প্রভাবশালী। এরপর আচরেকর তাকে ক্রিকেটে শিক্ষাদান শুরু করেন। শচীন তার বিদ্যালয়কে মাতুঙ্গা গুজরাতী সেবা মন্ডল শীল্ড জিতে নিতে সহায়তা করেন।
প্রথমে শচীন তেন্ডুলকর বোলিং এর দিকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। ১৯৮৭ সালে মাদ্রাজে এমআরএফ পেস ফাউন্ডেশনে ফাস্ট বোলিং করার প্রশিক্ষণ নিতে গেলে অস্ট্রেলিয়ার দ্রুতগতির ফাস্ট বোলার ডেনিস লিলি তাকে ব্যাটিংয়ে মনোনিবেশ করার পরামর্শ দেন। ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দের ২০শে জানুয়ারি মুম্বইয়ের ব্রেবোর্ন স্টেডিয়ামে ক্রিকেট ক্লাব অব ইন্ডিয়ার সূবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে এক প্রদর্শনী ম্যাচে ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানি ক্রিকেট দলের হয়ে শচীন পরিবর্তিত খেলোয়াড় হিসেবে খেলেন।
আরো পড়ুন : রোহিত শর্মা জীবনী
ঘরোয়া ক্রিকেট অধ্যায়
১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই নভেম্বর তেন্ডুলকর প্রথম রঞ্জি ট্রফি প্রতিযোগিতায় মুম্বই ক্রিকেট দলের হয়ে সুযোগ পেলেও কোন ম্যাচেই প্রথম একাদশে খেলার সুযোগ হয়নি তাঁর। এর পর এক প্রশিক্ষণ এর সময় ভারতীয় দলের অধিনায়ক কপিল দেবের বিরুদ্ধে শচীন-এর ব্যাটিং দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে দিলীপ বেঙ্গসরকার তাকে মুম্বই দলে প্রথম একাদশে সুযোগ দেন। এরপর ১৯৮৮ সালে ১১ই ডিসেম্বর শচীন ঘরোয়া প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে মুম্বই ক্রিকেট দলের হয়ে গুজরাত ক্রিকেট দলের বিরুদ্ধে খেলার সুযোগ পায়।
এই ম্যাচে তিনি ভারতের কনিষ্ঠতম ক্রিকেটার হিসেবে ১০০ রান করেন। এরপর তিনি দেওধর ট্রফি ও দিলীপ ট্রফিতেও শতরান করেন। ১৯৮৮ ও ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে শচীন দুইবার ইংল্যান্ড সফর করেন।তাঁর জীবনের প্রথম দ্বি-শতরান (২০৪) ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে ভারত সফরে আসা অস্ট্রেলিয়া জাতীয় ক্রিকেট দলের বিরুদ্ধে মুম্বই ক্রিকেট দলের হয়ে করেন। ২০০০ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিলে রঞ্জি ট্রফি প্রতিযোগিতার সেমি-ফাইনালে তামিলনাড়ু ক্রিকেট দলের বিরুদ্ধে অপরাজিত হয়ে তিনি আবার দ্বি-শতরান (২৩৩) রান করেন।
আরো পড়ুন : আগামী মরসুমের জন্য কী হতে পারে চেন্নাই সুপার কিংস এর প্রথম একাদশ, যা দলকে এনে দিতে পারে ষষ্ঠ ট্রফি!
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অধ্যায়
১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে করাচী টেস্টে তার আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেট অভিষেক হয়। এই ম্যাচে তাঁর পারফর্মেন্স খুব একটা ভালো হয়নি। এরপর একের পর এক টেস্ট ম্যাচে তিনি ভালো খেলার চেষ্টা চালাতে থাকেন। ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দের ইংল্যান্ড সফরে দ্বিতীয় টেস্টে বিশ্বের দ্বিতীয় কনিষ্ঠতম ক্রিকেটার হিসেবে তিনি তার জীবনের প্রথম আন্তর্জাতিক টেস্ট শতরান (১১৯) করেন। ১৯৯২ এর ক্রিকেট বিশ্বকাপের আগে অস্ট্রেলিয়া সফরে শচীন তেন্ডুলকর ২ টি শত রান করেন।
১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে অকল্যান্ড শহরে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শচীন তেন্ডুলকর প্রথম ওপেনার হিসাবে নামেন। এই ম্যাচে তিনি ৪৯ বলে ৮২ রান করেন। এরপর ওই বছরই শ্রীলঙ্কার কলম্বো শহরে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শতরান করেন। এটি তাঁর জীবনের প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শত রান ছিল।
১৯৯৬ ক্রিকেট বিশ্বকাপে তিনি দুইটি শতরান করেন এবং সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হন। কিন্তু এই বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কা প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জয় করে। ১৯৯৮ সালে এক ম্যাচে শচীন বিখ্যাত স্পিন বোলার শেন ওয়ার্নের বিরদ্ধে খেলে ২০৪ রান করেন এবং অস্ট্রেলিয়াকে পরাজিত করেন। ১৯৯৮ “কোকা কোলা কাপ” প্রতিযোগিতায় তিনি দুইটি গুরুত্বপূর্ণ শতরান করে ভারতকে ওই কাপ জয়ী করেন।
১৯৯৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতা চলাকালীন শচীন তেন্ডুলকর-এর পিতা রমেশ তেন্ডুলকরের মৃত্যু হয়, তিনি প্রতিযোগিতার মাঝেই পিতার সৎকারের জন্য ভারত ফিরে আসেন। শ্রাদ্ধ-এর অনুষ্ঠানের পর তিনি পুনরায় প্রতিযোগিতায় যোগ দেন এবং কেনিয়ার বিরুদ্ধে অপরাজিত ১৪০ রান করেন। এই শত রানটি তিনি তাঁর পিতাকে এই উৎসর্গ করেন। এত দিন পর্যন্ত তাঁর ক্রিকেট জীবন খুব ভালো চলছিল।
১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে মহম্মদ আজহারউদ্দীনের পর শচীন তেন্ডুলকর ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হিসাবে নির্বাচিত হন। কিন্তু এরপর ভারতের অস্ট্রেলিয়া সফর ও দক্ষিণ আফ্রিকা ভারত সফর দুই বারই ভারত পরাজিত হয়। এই পরাজয় সহ্য না করতে পেরে তিনি অধিনায়ক পদ থেকে ইস্তফা দেন।
২০০২ খ্রিষ্টাব্দে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে তিনি টেস্টে উনত্রিশতম শতরান করেন তারপরও এই ম্যাচ টি তে ভারত হেরে যায়। ২০০৩ সালে ক্রিকেট বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতায় শচীন তেন্ডুলকর ভারতকে ফাইনালে নিয়ে যেতে অনেক সহায়তা করলেও,ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ভারত পরাজিত হয়। ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে কনুইয়ের যন্ত্রণায় বেশিরভাগ সময় তিনি ক্রিকেট খেলতে বিরত থাকেন।
২০০৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৯শে মার্চ ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ২১ বলে মাত্র ১ রান করে আউট হলে দর্শকেরা প্রথমবার তাকে অনেক সমালোচনা করে। ২০০৭ ক্রিকেট বিশ্বকাপে ভারতের কোচ গ্রেগ চ্যাপেল তাঁকে নিচের খেলার কথা বলেন। শচীন তেন্ডুলকর প্রথমে রাজি না থাকলেও পরে তিনি ব্যাটিং অর্ডারে নিচের দিকে খেলেন। কিন্তু এই ম্যাচেও তিনি ভালো কোন ক্রীড়াকৌশল দেখাতে পারেননি।
দীর্ঘ খারাপ সময়ের পড়ে আবারও তিনি ঘুরে দাঁড়ান, ভারতবাসীর কাছে নিজেকে প্রমান করেন আবারও। তিনি বাংলাদেশ, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও টেস্ট ক্রিকেটে খুব ভালো পারফরম্যান্স দেখায়। ২০০৭ সালে ভারতের অস্ট্রেলিয়া সফরে একটি টেস্ট ম্যাচে তিনি ৪৯৩ রান করেন। ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে দক্ষিণ আফ্রিকা ভারত সফরে এলে একটি ম্যাচে তিনি কুঁচকিতে চোট পান। এই চোটের জন্য তিনি ২০০৮ এর এশিয়া কাপ খেলতে পারেননি।
এই সময় অস্ট্রেলিয়া সফরে তিনি ভারতকে জয় এনে দেন। এরপর আবারও একবার তিনি চোট পান। কিছু দিন খেলা থেকে বিরতও থাকেন। ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দের প্রথম দিকে শ্রীলঙ্কা সফরে তেন্ডুলকর ব্যর্থ হন কিন্তু পরেরদিকে নিউজিল্যান্ড সফরে জয় লাভ করেন এবং তাঁর বিয়াল্লিশতম টেস্ট শতরান করেন সম্পূর্ণ করেন। ত্রি-দেশীয় কম্প্যাক কাপে তিনি ভারতকে কাপজয়ী করেন।
এরপর আসে ২০১১ ক্রিকেট বিশ্বকাপ, এটি ছিল শচীন তেন্ডুলকর-এর জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সময়। এই বিশ্বকাপে ভারত শ্রীলঙ্কাকে পরাজিত করে বিশ্বকাপ জয় করে এবং শচীন তেন্ডুলকর ৪৮২ রান করে প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় এবং ভারতের সর্বাধিক রান সংগ্রাহক হন। এরপর তিনি আরও কিছু ম্যাচ খেলেছেন, শততম শতরান করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত ২০১২ সালে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়েছেন।
আরো পড়ুন : এবছর আইপিএলের কোয়ালিফাইয়ার ১ ম্যাচে খেলতে চলেছে কোন দুটি দল?
শততম শতরান
বিশ্বকাপের পরে জুলাই মাসে ইংল্যান্ড সফরে তেন্ডুলকরের টেস্ট ও একদিনের আন্তর্জাতিক মিলিয়ে শততম শতরানের সম্ভাবনার ব্যাপারে জনমানসে যথেষ্ট উৎসাহ দেখা যায়। কিন্তু তিনি সর্বাধিক ৯১ রান করতে পারেন। এই সফরে ভারত পরাজিত হয়।
এরপর ২০১১ খ্রিষ্টাব্দের ৮ই নভেম্বর তেন্ডুলকর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ফিরোজ শাহ কোটলা মাঠে খেলতে নেমেন আবারও শততম শতরানের সম্ভাবনা সামনে আসে। এইবারও শততম শতরানের রেকর্ড তাঁর অধরা থাকে কিন্তু এই ম্যাচে তিনি টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম ১৫,০০০ রান করার বিশ্বরেকর্ড করেন। ২০১২ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ মার্চ তেন্ডুলকর ২০১২ এশিয়া কাপ প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে খেলতে নেমে তার বহুপ্রতীক্ষিত শততম শতরান করে বিশ্বরেকর্ড করেন। তবুও এই ম্যাচে ভারত বাংলাদেশের কাছে পরাজিত হয়।
অবসর গ্রহণ
২০১২ খ্রিষ্টাব্দের ২৩শে ডিসেম্বর একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা করেন। তাঁর এই অবসর গ্রহণের কারন ছিল ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আশানুরূপ খেলতে না পারা। ২০১৩ সালে শচীন তেন্ডুলকর তাঁর জীবনের ২০০তম টেস্ট খেলে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার সিধ্যান্ত নেন। সেই মত মুম্বাইতে অনুষ্ঠিত তার ২০০তম টেস্ট ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে তিনি ৭৪ রান করেন।
টোয়েন্টি ২০ ক্রিকেট
২০০৬ সালে শচীন তেন্ডুলকর তাঁর জীবনের প্রথম ও শেষ আন্তর্জাতিক টোয়েন্টি ২০ ক্রিকেট ম্যাচটি খেলেন। এরপর তিনি আর কোন আন্তর্জাতিক টোয়েন্টি ২০ ক্রিকেটে অংশ গ্রহণ করেননি।
কিন্তু তিনি ২০০৮ সালে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ প্রতিযোগিতায় মুম্বই ইন্ডিয়ান্স দলের অধিনায়ক হিসাবে খেলেন এবং তাঁর টিমকে ফিনালেতে নিয়ে যান। ২০১৩ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ টুয়েন্টি২০ প্রতিযোগিতায় খেলার পর তেন্ডুলকর টুয়েন্টি২০ ক্রিকেট থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
রেকর্ডস
ব্যাটিং রেকর্ড
- সর্বাধিক আন্তর্জাতিক রান: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৩৪,০০০ এরও বেশি রান (টেস্ট + ওয়ানডে)।
- সর্বাধিক আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরি: ১০০ আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরি (টেস্টে ৫১, ওয়ানডেতে ৪৯)।
- সর্বাধিক টেস্ট রান: টেস্ট ক্রিকেটে ১৫,৯২১ রান – যেকোনো খেলোয়াড়ের সর্বোচ্চ।
- সর্বাধিক ওয়ানডে রান: ওডিআইতে ১৮,৪২৬ রান – সর্বকালের সর্বোচ্চ।
- ওয়ানডেতে ডাবল সেঞ্চুরি করা প্রথম ব্যক্তি: শচীন তেন্ডুলকর
- ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ২০০ রান।
- আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বাধিক অর্ধশতক: টেস্ট এবং ওয়ানডেতে ১৬০টিরও বেশি অর্ধশতক।
- ওডিআইতে সর্বাধিক ম্যান অফ দ্য ম্যাচ পুরস্কার: ৬২টি পুরষ্কার।
- ওয়ানডেতে সর্বাধিক ম্যান অফ দ্য সিরিজ পুরস্কার: ১৫টি পুরষ্কার।
- বিদেশে টেস্ট সেঞ্চুরি করা সর্বকনিষ্ঠ ভারতীয়: ১৭ বছর বয়সে, ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে (১৯৯০)।
বিশ্বকাপ রেকর্ড
- বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বাধিক রান: ৬টি সংস্করণে ২,২৭৮ রান।
- ৬টি বিশ্বকাপে খেলা একমাত্র খেলোয়াড় (১৯৯২-২০১১)।
- ২০১১ সালে আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপ জিতেছেন।
অন্যান্য রেকর্ড
- দীর্ঘতম আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার: ২৪ বছর (১৯৮৯-২০১৩)।
- সর্বাধিক টেস্ট এবং ওয়ানডে উপস্থিতি: ২০০ টেস্ট, ৪৬৩ ওয়ানডে।
শচীন তেন্ডুলকর-এর মোট সেঞ্চুরি
শচীন টেন্ডুলকর মোট ১০০টি আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরি করেছেন, যা হল তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিশ্ব রেকর্ড।
- টেস্ট সেঞ্চুরি: ৫১
- ওয়ানডে সেঞ্চুরি: ৪৯
- মোট ১০০টি সেঞ্চুরি
এই অবিশ্বাস্য মাইলফলকটি ১৬ মার্চ, ২০১২ সালে এশিয়া কাপের একটি ওডিআই ম্যাচে বাংলাদেশের বিপক্ষে তিনি পূর্ণ করেছিলেন।
শচীন তেন্ডুলকরের অর্জিত বিশেষ পুরস্কার
ক্রিকেটে অসামান্য অবদানের জন্য শচীন টেন্ডুলকার জীবনভর নানান পুরষ্কার এবং সম্মাননা পেয়েছেন।
জাতীয় পুরস্কার
- ভারত রত্ন (২০১৪); ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার। তিনি প্রথম এবং একমাত্র ক্রীড়াবিদ যিনি এটি পেয়েছেন।
- পদ্ম বিভূষণ (২০০৮);ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার
- পদ্মশ্রী (১৯৯৯); ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার
- রাজীব গান্ধী খেলরত্ন (১৯৯৭-৯৮); তৎকালীন ভারতের সর্বোচ্চ ক্রীড়া সম্মান
- অর্জুন পুরস্কার (১৯৯৪); ক্রীড়ায় শ্রেষ্ঠত্বের জন্য
আন্তর্জাতিক ও বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি
- উইজডেন ক্রিকেটার অফ দ্য ইয়ার (১৯৯৭)
- আইসিসি ক্রিকেটার অফ দ্য ইয়ার (LG People’s Choice Award) (২০১০)
- লরিয়াস ওয়ার্ল্ড স্পোর্টস অ্যাওয়ার্ডস – স্পোর্টিং মোমেন্ট অফ দ্য ইয়ার (২০২০)
- ভারতীয় দলের সাথে ২০১১ বিশ্বকাপ জয় উদযাপনের জন্য
ক্রিকেট-নির্দিষ্ট সম্মাননা
- ওয়ানডেতে সর্বাধিক ম্যান অফ দ্য ম্যাচ পুরস্কার – ৬২ বার
- ওয়ানডেতে সর্বাধিক ম্যান অফ দ্য সিরিজ পুরস্কার – ১৫ বার
- আইসিসি ক্রিকেট হল অফ ফেমে অন্তর্ভুক্ত – (২০১৯)
অন্যান্য সম্মাননা
- সম্মানসূচক গ্রুপ ক্যাপ্টেন – ভারতীয় বিমান বাহিনী (২০১০)
- রাজ্যসভার সদস্য (উচ্চ সংসদ) – ২০১২ সালে মনোনীত
- সম্মানসূচক ডক্টরেট – মাইসোর বিশ্ববিদ্যালয় এবং অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয় সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
শচীন তেন্ডুলকর-কে নিয়ে উল্লেখযোগ্য কিছু বিতর্ক
বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগ
২০০১ সালে ভারতের দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের সময়, ম্যাচ রেফারি মাইক ডেনেস শচীন টেন্ডুলকার সহ ছয় ভারতীয় খেলোয়াড়কে শাস্তি দিয়েছিলেন বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগে। টেন্ডুলকারের বিরুদ্ধে বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগ আনা হয়েছিল – আম্পায়ারদের না জানিয়ে বলের সিম থেকে ময়লা অপসারণের অভিযোগ।
ফেরারি আমদানি শুল্ক মওকুফ
২০০২ সালে ডন ব্র্যাডম্যানের ২৯টি টেস্ট সেঞ্চুরির রেকর্ড সমকক্ষ হওয়ার পর ফিয়াট টেন্ডুলকারকে ফেরারি “৩৬০ মোডেনা” উপহার দেয়। কোম্পানির অনুরোধে ভারত সরকার আমদানি শুল্ক (প্রায় ₹১.১৩ কোটি) মওকুফ করে। একজন কোটিপতি ক্রিকেটারের কর মওকুফ জনসাধারণের সমালোচনার জন্ম দেয়।
অনেকেই প্রশ্ন তোলেন কেন একজন ধনী সেলিব্রিটিকে এত বড় কর মওকুফ দেওয়া হয়েছিল, যেখানে সাধারণ নাগরিকরা আমদানির উপর ভারী শুল্ক দিতেন। পরবর্তীতে এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে টেন্ডুলকার অবশেষে নিজেই আমদানি শুল্ক পরিশোধ করেছিলেন। ফেরারিটি পরে ২০১১ সালে তিনি বিক্রি ও করেছিলেন।
“আমি প্রথমে ভারতীয়” বিবৃতি – ২০০৯
মহারাষ্ট্রে ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে, বিশেষ করে “মারাঠিরা প্রথম” পরিচয় প্রচারকারী শিবসেনার দ্বারা, শচীন একটি সংবাদমাধ্যমের সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন: “মুম্বাই সকল ভারতীয়ের। আমি একজন মহারাষ্ট্রীয়, তবে আমি প্রথমে ভারতীয়।” শিবসেনা নেতা বাল ঠাকরে টেন্ডুলকারের সমালোচনা করে বলেছিলেন যে তার ক্রিকেটে মনোনিবেশ করা উচিত এবং রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া উচিত নয়। তার দেশপ্রেমিক অবস্থানের জন্য শচীন জনসাধারণ এবং রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে ব্যাপক সমর্থন পেয়েছিলেন।
এক সাথে ২ জায়গায় দায়িত্ত পালনের অভিযোগ – ২০১৯
আইপিএলে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের পরামর্শদাতা/ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় টেন্ডুলকার বিসিসিআইয়ের ক্রিকেট উপদেষ্টা কমিটির (সিএসি) সদস্য ছিলেন। এটি বিসিসিআইয়ের নিয়ম লঙ্ঘন করে যে কেউ সম্ভাব্য দ্বন্দ্বের সাথে একাধিক পদে থাকতে পারে না। শেষ পর্যন্ত শচীন তেন্ডুলকর সিএসি থেকে পদত্যাগ করেন।
বাক্তিগত জীবন
শচীন টেন্ডুলকর ১৯৯৫ সালের ২৪শে মে মাসে শিশু বিশেষজ্ঞ ডাঃ অঞ্জলি টেন্ডুলকারকে বিয়ে করেন। শচীনের ক্রিকেট যাত্রায় সহায়তা করার জন্য এবং তাদের পরিবার পরিচালনা করার জন্য অঞ্জলি তার চিকিৎসা জীবন ত্যাগ করেন। তাদের দুই সন্তান সারা সারা টেন্ডুলকর ও অর্জুন টেন্ডুলকর। সারা, ১৯৯৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন, তিনি যুক্তরাজ্যে পড়াশোনা করেন এবং লাইমলাইট থেকে দূরে থাকেন, এবং অর্জুন, ১৯৯৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন, তিনি একজন উদীয়মান ক্রিকেটার এবং মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের হয়ে আইপিএল খেলেন।
আর্থিক প্রতিপত্তি
শচীন টেন্ডুলকারের আনুমানিক মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ₹১,৪০০-১,৫০০ কোটি, যা ব্র্যান্ড এনডোর্সমেন্ট, ব্যবসায়িক উদ্যোগ এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্জিত। তিনি কোকা-কোলা, বিএমডব্লিউ এবং অ্যাডিডাসের মতো শীর্ষ ব্র্যান্ডের প্রচার করেন এবং প্রতি ইভেন্টে ১-২ কোটি টাকা চার্জ করেন।
তার রিয়েল এস্টেট পোর্টফোলিওর মধ্যে রয়েছে মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় সমুদ্রমুখী ১০০ কোটি টাকার একটি বিলাসবহুল বাড়ি, পুনে এবং কেরালায় সম্পত্তি এবং ভারত জুড়ে অন্যান্য বিনিয়োগ। তিনি এসআরটি স্পোর্টস ম্যানেজমেন্টও পরিচালনা করেন এবং খেলাধুলা এবং আতিথেয়তা উদ্যোগে বিনিয়োগ করেছেন, যা তাকে ভারতের সবচেয়ে ধনী এবং সবচেয়ে সফল প্রাক্তন ক্রীড়াবিদদের একজন করে তুলেছে।
F.A.Q: Sachin Tendulkar Biography in Bengali
১।শচীন টেন্ডুলকর কে?
শচীন টেন্ডুলকর একজন প্রাক্তন ভারতীয় ক্রিকেটার।
২। শচীন টেন্ডুলকার এর জন্ম কবে হয়?
শচীন টেন্ডুলকার এর জন্ম হয় ২৪ এপ্রিল ১৯৭৩ সালে।
৩। শচীন টেন্ডুলকার এর স্ত্রীর নাম কী?
শচীন টেন্ডুলকার এর স্ত্রীর নাম অঞ্জলী টেন্ডুলকার।
৪। শচীন টেন্ডুলকার কী কী পুরস্কার পান?
শচীন টেন্ডুলকার পুরস্কার পান – খেল রত্ন, ভারত রত্ন ও অর্জুন পুরস্কার।
৫।শচীন টেন্ডুলকার কবে ভারতরত্ন পান?
শচীন টেন্ডুলকার ভারত রত্ন পান ২০১৪ সালে।
৬। শচীন টেন্ডুলকার কবে অর্জুন পুরস্কার পান?
শচীন টেন্ডুলকার ১৯৯৪ সালে অর্জুন পুরস্কার পান।
৭।শচীন টেন্ডুলকার শততম সেঞ্চুরি কোন টিম এর বিরুদ্ধে করেন?
শচীন টেন্ডুলকার শততম সেঞ্চুরি বাংলাদেশ টিম এর বিরুদ্ধে করেন।
নমস্কার, প্রিয় পাঠকগণ। আমার নাম শুভম বিশ্বাস। আমি গত ৫-৬ বছর ধরে ব্লগিং করছি। এই ব্লগটা শুরু করেছি বাংলায় ক্রিকেট খবর এবং আইপিএল নিয়ে লেখার জন্য। ক্রিকেট আমার ছোটবেলা থেকেই একটা ভালোলাগার জায়গা তাই সেই ভালো লাগাকে কাজে লাগিয়ে এই নতুন উদ্যোগ।