আর মাত্র কয়েকদিনের অপেক্ষা। তারপরেই শুরু হবে ইংল্যান্ড বনাম ভারত টেস্ট সিরিজ। ২০০৭ সালের পর ভারতীয় দল ইংল্যান্ডের মাটিতে একটিও টেস্ট সিরিজ জিততে পারেনি। তবে আপনারা কি জানেন, শেষবার যখন আমরা ইংল্যান্ডে খেলতে গেছিলাম, তখন বিরাট কোহলির নেতৃত্বে আমাদের কাছে ছিল টেস্ট সিরিজ জেতার সুবর্ণ সুযোগ। ২০২১ সালে যখন আমাদের দেশ ভারতবর্ষ ইংল্যান্ডের মাটিতে গেছিলো টেস্ট সিরিজ খেলতে, তখন সর্বকালের সেরা টেস্ট অধিনায়ক বিরাট কোহলির নেতৃত্বে সেই সিরিজ আমরা ড্র করে ফিরেছিলাম।
আজকের আর্টিকেল গতবারের এই সিরিজ নিয়েই।
২০২১-২২ ইংল্যান্ড সফরের প্রথম টেস্ট ম্যাচটি শুরু হয়, ৪ অগাস্ট, ইংল্যান্ড এর ট্রেন্ট ব্রিজ, নটিংহ্যাম তে। প্রথম ম্যাচের ফল হয় ড্র। কিন্তু এমনি এমনি এই ম্যাচ ড্র হয়নি। এর পেছনে ইংল্যান্ড এর আবহাওয়া বা বৃষ্টি অন্যতম কারণ। চলুন, একটু ভেঙে বলা যাক।
প্রথম ম্যাচে টস হয় দুই দেশের অধিনায়ক জো রুট এবং বিরাট কোহলির মধ্যে। টসে জিতে ইংল্যান্ড এর অধিনায়ক জো রুট ব্যাটিং এর সিদ্ধান্ত নেন।
ইংল্যান্ড এর বিপক্ষে ভারতীয় দলে ছিল সেই সময় একের পর চমকপ্রদ নাম। রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি, রবীন্দ্র জাদেজা, ঋষভ পন্ট, জাসপ্রিত বুমরাহ ইত্যাদি। ইংল্যান্ড এর ব্যাটিং করার সিদ্ধান্তকে শীঘ্রই ভুল প্রমান করতে ভারত অধিনায়ক বিরাট কোহলি শুরুতেই বল তুলে দেন ভারতের প্রধান অস্ত্র জাসপ্রিত বুমরাহ’র হাতে। এই সিদ্ধান্ত একদম যে সঠিক প্রমান হয় তা বুমরাহ প্রমান করে দেয় নিজের বোলিং স্পেল এর প্রথম ওভার এই। এবং তুলে নেন ইংল্যান্ড এর ওপেনার রোরি বার্নস কে, প্রথম ওভারের ৫ নাম্বার বলে।
তারপর ২০ ওভার ইংল্যান্ড একটু একটু করে ব্যাটিং করে, ডি শিবলে এবং জ্যাক ক্রাউলি এর মধ্যে ৪২ রানের একটি পার্টনারশীপ হলেও, কিছু সময়ের মধ্যেই মহম্মদ স্বামী এবং মহম্মদ সিরাজ এর বলে একে একে আউট হয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরে যান এই দুজন ব্যাটসম্যান যথাক্রমে মাত্র ১৮ এবং ২৭ রান করেই। এরপর অবশ্য একটা লম্বা ৭২ রানের পার্টনারশীপ লক্ষ্য করা যায়, জো রুট এবং জনি ব্যারিস্টওর মধ্যে, তবে ৫০তম ওভারের দ্বিতীয় বলে, আউট হয়ে প্যাভিলিয়ান ফিরে যান জনি ব্যারিস্টও, মহম্মদ সামির বলে।
ব্যাস এরপর, একে একে ইংল্যান্ড এর একটার পর একটা উইকেট পড়তেই থাকে। এবং প্রথম দিনের ৬৫ তম ওভারের ৪ নম্বর বলেই শেষ হয়ে যায় ইংল্যান্ড এর প্রথম ইনিংস। ইংল্যান্ড এর হয়ে প্রথম ইনিংসে সব থেকে বেশি রান আসে, জো রুট এর ব্যাট থেকেই। তিনি খেলেন ৬৫ রানের এক ইনিংস। এছাড়াও ইংল্যান্ড এর ইনিংস যখন ১৮৩ রানে শেষ হয়ে যায়, তখন স্যাম কারান থাকেন অপরাজিত ২৭ রানে।
ভারতের হয়ে বোলিং করে, রবীন্দ্র জাদেজা ছাড়া, সবাই কম বেশি উইকেট পেয়ে থাকে যার মধ্যে বুমরাহ নেই ৪টি উইকেট, সামি তিনটি, শার্দুল ঠাকুর দুটি এবং সিরাজ নেই একটি উইকেট।
রান করতে এসে ভারতের হয়ে ব্যাটিং করে আসেন রোহিত শর্মা এবং কে এল রাহুল। শুরুটা ভারতের বেশ প্রশংসনীয় হয়। ৯৭ রানের একটা লম্বা পার্টনারশীপ রোহিত শর্মা এবং কে এল রাহুল এর মধ্যে। কিন্তু ৩৭তম ওভারের তৃতীয় বলে এই পার্টনারশীপ ভেঙে যায় অলি রবিনসন এর বলে। রবিনসন নেন প্রথম উইকেট এবং সেই উইকেটটি ছিল রোহিত শর্মার। রোহিত এদিন খেলেন ৩৬ রানের এক ইনিংস। এরপর কে এল রাহুল একদিক ধরে খেললেও, উল্টো দিক থেকে একে একে উইকেট পড়তে থাকে, চেতেশ্বর পূজারা, বিরাট কোহলি এবং আজিঙ্ক্য রাহানের রূপে। পূজারা, কোহলি এবং রাহানে এদিন রান করেন যথাক্রমে ৪, ০ এবং ৫। এই তিন ব্যাটসম্যানের মধ্যে রাহানের উইকেটটি রান আউট রূপে এলেও, পূজারা এবং কোহলির উইকেট তুলে নেন ইংল্যান্ড এর কিংবদন্তি বোলার জেমস আন্ডারসং। মনে রাখার বিষয় এবার থেকে এই ইংল্যান্ড বনাম ভারত সিরিজ টেন্ডুলকার এবং অ্যান্ডার্সন এর নামানুসারেই হবে।
ঋষভ পন্ট একটি ঝোড়ো ২০ বলে ২৫ রানের ইনিংস খেললেও, অলি রবিনসন এর বলে সেও আউট হয়ে প্যাভিলিয়ান ফিরে যায়। তারপর জেমস অ্যান্ডার্সন অবশেষে আউট করতে সক্ষম হন কে এল রাহুল কে। যদিও রাহুল এদিন দুর্দান্ত খেলাটাই খেললেন এবং নিজের টিমকে একটা ভালো জায়গায় আন্তে সক্ষম হলেন। রাহুল খেলেছিল, ৮৪ রানের এক ইনিংস। রাহুল এর পর, টেইল এন্ডার এর সাথে ব্যাটিং করে ৫৬ রানের এক ইনিংস খেলেন রবীন্দ্র জাদেজা এবং ২৮ রান করতে সক্ষম হন জাসপ্রিত বুমরাহও।
ভারতের ইনিংস তৃতীয় দিনে শেষ হয় ২৭৮ রানে, ৮৪.৫ ওভার এর পর। ইংল্যান্ড এর হয়ে জেমস অ্যান্ডার্সন ৫টি এবং অলি রবিনসন ৪টি উইকেট তুলতে সক্ষম হন।
ভারতীয় দল ৯৫ রানের লিড নিয়ে এগিয়ে থাকে। এবং শুরু হয় ইংল্যান্ড এর দ্বিতীয় ইনিংস।
দ্বিতীয় ইনিংসে জবাবে ইংল্যান্ড শুরুটা মন্দ করেনি। ৩৭ রানের ওপেনিং পার্টনারশীপ এর পর, ৪৬ রানে, পরে ইংল্যান্ড এর দ্বিতীয় উইকেট। আর তারপর আসে এই ম্যাচের অন্যতম সেরা ইনিংস জো রুট এর ব্যাট থেকে। জো রুট এদিন খেলেন ১০৯ রানের একটা লম্বা ইনিংস এবং অধিনায়ক এর দায়িত্বটা বেশ ভালোরকমই পালন করেন। কথাই আছে না, দেখা দেখি শাখা পড়া, জো রুট কে দেখে, নিজেদের মতন ঠিকঠাক ইনিংস খেলেন জনি ব্যারিস্ট, লরেন্স, জস বাটলার, স্যাম কারান এবং অলি রবিনসন। এই সকল ব্যাটসম্যান এর রান এক ঝলকে দেখে নেওয়া যাক।
রোরি বার্নস ১৮, ডি শিবলি ২৮, জো রুট ১০৯, ব্যারিস্টও ৩০, লরেন্স ২৫, জস বাটলার ১৭, স্যাম করান ৩২ এবং রবিনসন ১৫। অবশেষে ইংল্যান্ড এর ইনিংস শেষ হয় চতুর্থ দিনে ৮৫ ওভার ৫ বলে, ৩০৩ রান ১০ উইকেট পতনের পর।
ভারতীয় বোলাররা এদিন খুব একটা ভালো বোলিং না করে থাকলেও, কিছু কিছু বোলারের কারণেই ইংল্যান্ড কে অবশেষে আটকাতে সক্ষম হয়েছিলাম আমরা। রবীন্দ্র জাদেজা এই ইনিংসে একটিও উইকেট পাননি। তবে বুমরাহ পাই ৫টি উইকেট, সামি ১টি উইকেট, সিরাজ এবং ঠাকুর যথাক্রমে তুলে নেন দুটি করে উইকেট।
জো রুটকে এদিন বুমরাহই আউট করেন।
ভারতের সামনে থাকে ২০৮ রানের লক্ষ্য। ভারত কিন্তু চতুর্থ দিনের শেষ দিকে জেতার লক্ষ্য নিয়েই ব্যাটিং করতে নেমেছিল, কারণ ম্যাচে এগিয়ে ভারতই ছিল। ভারতের হয়ে তখন দ্বিতীয় ইনিংস খেলতে নামে রোহিত শর্মা এবং কে এল রাহুল। রোহিত এবং রাহুলের মধ্যে এদিন হয় ৩৪ রানের ওপেনিং পার্টনারশীপ, যা ভেঙে দেয় স্টুয়ার্ড ব্রড, কে এল রাহুল এর উইকেট নিয়ে। এবং এটিই ছিল স্টুয়ার্ট ব্রড এর এই সিরিজ এবং ম্যাচের প্রথম উইকেট। তারপর অবশ্য ভারতের আর উইকেট পড়েনি। রোহিত এবং পূজারা দুজনেই ১২ রান করে অপরাজিত থাকেন, এবং চতুর্থ দিন শেষ হয়।
ভারতের ৫২ রানে, ১ উইকেট পতনের পর চতুর্থ দিন শেষ হয়। পঞ্চম দিনে, ভারতের কাছে জেতার জন্যে লক্ষ্য ছিল ১৫৭ রান এবং ৯টি উইকেট আর একটা পুরো দিন। ভারতের কাছে ছিল, একের পর এক দুর্দান্ত ব্যাটসম্যানরা। যেমন রোহিত, পূজারা, কোহলি, রাহানে, ঋষভ, জাদেজা ইত্যাদি। কিন্তু আমাদের জন্য ছিল দুর্ভাগ্য। কারণ পঞ্চম দিন একটি ওভার না হয়েও ম্যাচ বন্ধ হয়ে যায় বৃষ্টির কারণে। এবং এই কারণে এই ম্যাচ ড্র হয় এবং ম্যাচের সেরা নির্বাচিত করা হয় জো রুট কে।
হয়তো যদি পঞ্চম দিনের খেলা হতো তবে ম্যাচের সেরা নির্বাচিত হতে পারতো জাসপ্রিত বুমরাহ, এবং ম্যাচের রেজাল্ট হতে পারতো আমাদের পক্ষে। কিন্তু ওই যে বললাম আমাদের দুর্ভাগ্য। নাহলে ইংল্যান্ড সফর ২০২১ এর প্রথম ম্যাচ এবং ওই সম্পূর্ণ সিরিজ এর পরিনাম ড্র না হয়ে হতে পারতো ভারতের পক্ষে এবং ২০০৭ এর পর ২০২১ এই আমরা বিরাট কোহলির নেতৃত্বে ইংল্যান্ড সিরিজ জিতে ফিরতে পারতাম। কিন্তু ওই যে বললাম আমাদের দুর্ভাগ্য। কোহলির দুর্ভাগ্য।
আমাদের এই আর্টিকেলটি কেমন লাগলো, জানাতে ভুলবেন না কমেন্টে। এরকম ক্রিকেট সম্পর্কিত আর্টিকেল বাংলায় আরো দেখতে অবশ্যই যুক্ত থেকেন। আমরা ফিরবো খুব শিগগিরই আরও নতুন ক্রিকেটের গল্প ও আর্টিকেল নিয়ে।
নমস্কার, প্রিয় পাঠকগণ। আমার নাম শুভম বিশ্বাস। আমি গত ৫-৬ বছর ধরে ব্লগিং করছি। এই ব্লগটা শুরু করেছি বাংলায় ক্রিকেট খবর এবং আইপিএল নিয়ে লেখার জন্য। ক্রিকেট আমার ছোটবেলা থেকেই একটা ভালোলাগার জায়গা তাই সেই ভালো লাগাকে কাজে লাগিয়ে এই নতুন উদ্যোগ।